শিশির মঞ্চে মঞ্চস্থ হলো গোবরডাঙ্গা রূপান্তর এর " এক সন্ধ্যায় দুই নাটক " সৌদামিনী এবং আমি আগন্তুক
ইন্দ্রজিৎ আইচ (কলকাতা): গোবরডাঙ্গা রূপান্তর উত্তর ২৪ পরগনার সব থেকে পুরোনো নাট্য দল। এই দলের বয়স ৫২ বছর। বহু নাটক তারা করেছে। এখনো করে চলেছেন। সম্প্রতি কলকাতার শিশির মঞ্চে মঞ্চস্থ হলো রূপান্তর নাট্য দলের দুটি নাটক সৌদামিনী ও আমি আগন্তুক। প্রথম নাটক "সৌদামিনী" র কাহিনী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। নাট্যরূপ দিয়েছেন গৌতম রায়।
এই নাটকটি পরিচালনা করেছেন অভীক দাঁ।
গোবরডাঙ্গা রূপান্তরের প্রযোজনা সৌদামিনী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও নারী চেতনার মেলবন্ধন। কল্পনা দত্ত প্রমুখ বিপ্লবী নারীর সাহসিকতার প্রতিফলন এই নাটকে ধরা পড়েছে। ‘বদনাম’ গল্প ও অন্যান্য লেখার ভিত্তিতে নির্মিত হলেও এর নাট্যরূপ ও উপস্থাপনায় এক নতুন স্বর তৈরি হয়েছে। এই নাটকে সৌদামিনী চরিত্রে সুদীপ্তা মুখার্জী,গিরিশ (সুবীর নারায়ণ দাস), বিজয় (অভীক দাঁ), বিনয়, কেনারাম ( মনোদীপ সরকার), মুকন্দ( গৌতম দাস),গদাই চন্দন দেবনাথ), গ্রামবাসী ( দেবদত্ত কর্মকার) , অনিল (অতনু পাল) ও নিতাই (স্বরূপ দেবনাথ) চরিত্রের অভিনয় নাটককে প্রাণবন্ত করেছে। সেই সঙ্গে সেট ডিজাইন (দেবদত্ত কর্মকার), আলো (সৌম্য হরি) ও সঙ্গীত (স্বপন বন্দ্যোপাধ্যায়) নাটককে সমৃদ্ধ করেছে। প্রতিটি দৃশ্য ও আবহ দর্শকদের এক ভিন্ন সময় ও আবেগে পৌঁছে দেয়। সৌদামিনী কেবল রাজনৈতিক নাটক নয়, এটি নারী আত্মমর্যাদা ও প্রতিবাদের দৃঢ় কণ্ঠস্বর। রবীন্দ্রনাথের ভাবনার প্রতি সম্মান রেখে প্রযোজনাটি সমকালীন আবেদন তৈরি করেছে। এটি বিনোদনের পাশাপাশি চিন্তারও খোরাক জোগায়। এই সন্ধায় দ্বিতীয় নাটকটি ছিল আমি আগন্তুক। নাট্যকার শিবংকর চক্রবর্তী।
নির্দেশনা দিয়েছেন এই দলের কর্ণধার ও গোবরডাঙ্গা র সব থেকে প্রবীণ নাট্য ব্যক্তিত্ব শ্যামল দত্ত । আমি আগন্তুক নাটকের গল্পটি সংক্ষেপে হলো এক পরিবারে হঠাৎ এসে হাজির এক রহস্যময় ব্যক্তি—নিজেকে পরিচয় দেন সাহিত্যিক বিমলানন্দ সাউ হিসেবে। তিনি কি সত্যিই সেই সাহিত্যিক, নাকি অন্য কেউ? এই প্রশ্নকে ঘিরেই আবর্তিত হয় নাটক ‘আমি আগন্তুক’। নাটক জুড়ে উন্মোচিত হয় পরিচয়ের সংকট, বিশ্বাস-অবিশ্বাস, পরিবার, রাজনীতি ও মানবিকতার টানাপোড়েন। অভিনয়ে লিনা দাস (সুজাতা), শুভ বিশ্বাস (স্বাধীন), অভীক দাঁ (প্রিয়তোষ), চন্দন দেবনাথ ( রুণু ঘোষ)
অতনু পাল (সুধাকর), স্বরূপ দেবনাথ (বিমলানন্দ) এদের অভিনয় বিশেষভাবে উজ্জ্বল। পাশাপাশি এই নাটকে আলো ও আলোক প্রক্ষেপণ (বরুণ কর ও সৌম্য হরি) মঞ্চে রহস্য এবং উত্তেজনার পরিবেশ তৈরিতে অসাধারণ মুহূর্ত সৃষ্টি করেছে। আবহ (জয়ন্ত মিত্র) সংলাপের আবেগ বাড়িয়ে তোলে, কখনো অনুপস্থিতি দিয়ে নিস্তব্ধতা জাগায়। মঞ্চ নির্মাণ (স্বরূপ দেবনাথ ও দেব কর্মকার) সীমিত পরিসরে শহর ও পরিবারের আবহ সৃষ্টি করেছেন । রূপসজ্জা (অভীক দাঁ) প্রতিটি চরিত্রের বৈশিষ্ট্য রূপটানে প্রকাশ করেছেন।
শেষে আগন্তুকের অন্তর্ধান শুধু এক চরিত্রের হারিয়ে যাওয়া নয়, সমাজের স্নেহ-ভালবাসার প্রতীক হারিয়ে যাওয়ার বেদনাও বয়ে আনে।
‘আমি আগন্তুক’ শুধু একটি নাটক নয়—এ এক দার্শনিক আত্মযাত্রা, যা দর্শককে ভাবায় ও প্রশ্ন করতে শেখায়। সব মিলিয়ে গোবরডাঙ্গা রূপান্তর এর দুটি ভিন্ন আঙ্গিকের নাটক সেদিন শিশির মঞ্চে বৃষ্টি ভেজা সন্ধায় দারুন জমে উঠেছিলো।
Comments
Post a Comment