একাডেমী তে অঙ্গন বেলঘরিয়া র সুমতি সেনগুপ্ত স্মৃতি সন্মাননা প্রদান এবং মঞ্চস্থ হলো নতুন নাটক নীলামবালা ছে আনা
ইন্দ্রজিৎ আইচ (কলকাতা):আমাদের পশ্চিমবঙ্গে রাজনীতির ইতিহাস স্মৃতির পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। আর এই বাংলার ইতিহাস কে ফিরে তাকাতে গেলে চলে যেতে হবে অনেক পেছনে। ৬০/৭০ অথবা ৮০ র দশকে। সে এক সময় ছিলো। উত্তাল অবিভক্ত বাংলা। সময়ের অনু শাসনে বিশ্বাস গড়ে, ভাঙে। সবকিছুরই শিশুকাল থাকে। জীবন, কৃষ্টি, সংস্কৃতি, সমাজের আবরণ, মিলেমিশে সে বাড়ে। তারও কৈশোরকাল যৌবনবেলার উচ্ছ্বাসের খড়স্রোতে শরীর ভাসিয়ে মধ্য বয়সের পাড়ে এসে বিশ্রাম নেয়। সেখানেই তার বার্ধক্যের আতিপাতি। একটু একটু করে ন্যুব্জ হয়। এই দীর্ঘ যাত্রাপথের চর্বিত চর্বন তখন তার বেঁচে থাকার মূল্যায়ন। দীর্ঘশ্বাসে মেশানো হিসেবনিকেশ। এ নাটকও তার চলার পথকে সময়ের সাত কাহনের অলঙ্কারে সুসজ্জিত করে এগিয়ে চলে। উত্তাল ষাটের দশকে কিশোর নীলমবালার হাত ধরে বালক উদ্দালক পেরোতে থাকে সত্তরের বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ। টর্নেডো সত্তরের বেপরোয়া ঝাপটা কাটতে না কাটতেই আবার বেসামাল জীবনের আলোবাতাস। রেল ধর্মঘট, অবরুদ্ধ গোটা দেশ, নেতৃত্বের নগ্ন বেইমানিতে মুখ থুবড়ে পড়া আন্দোলনের উল্কাপিন্ড। তারপর! পরিবর্তন। পরিবর্তনের সাতাত্তর। দারুন স্বপ্নময়তার আবেশে কাশফুলের দোলা লাগে ঘরে ঘরে। জীবনের কানায় কানায় পূর্ণতা। এই বাংলার মানুষ যেমন দেখেছেন উত্তম - সৌমিত্র র ছবি, শুনেছেন হেমন্ত - মান্না - কিশোর কুমার আর মানবেন্দ্র র গান, সেই রকম
ইস্টবেঙ্গল - মোহনবাগান এর ফুটবল খেলা, পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সমাজ অর্থনীতি, চাকরি,
বেকারত্ব এই সব নিয়েও সেই সময় হয়েছে অনেক বিতর্ক। এভাবেই এগোয়। এগোতে হয়। কখন যেন জোয়ার পাল্টে পাল্টে ধূ ধূ ভাঁটায় পরিণত হয় জীবন নদীর চরাচর। উদ্দালক আজ ষাট পেরোনো ত্রিকালজ্ঞ যেন! বৃদ্ধ নীলামবালা তার সাক্ষ্যবাহী দোসর। শুধুই ইতিহাস। ইতিহাসের জরাজীর্ণতাকে তুচ্ছ করে পুনরায় স্বপ্নের ফেরিওয়ালা হয়ে ওঠে দুটি বেঁচে থাকা শরীর। আবারও বিশ্বাসের ডাক দেয় দুটি তরতাজা শেষপ্রহর! অঙ্গন বেলঘরিয়ার নতুন নাটক
শান্তনু মজুমদার এর লেখা " নিলামবালা ছে আনা " গত ২৬ আগস্ট ২০২৫ ( মঙ্গলবার ) একাডেমী মঞ্চ সন্ধ্যা ৬-৩০ টায় মঞ্চস্থ হলো। শান্তনু মজুমদারের লেখা এই নাটক ষাট সত্তরের দশক কে মনে করিয়ে দেবে আপনাদের। এই নাটক পরিচালনা করেছেন অঙ্গন বেলঘরিয়া র কর্ণধার এবং নির্দেশক অভি সেনগুপ্ত। মঞ্চে বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন সমীর চট্টোপাধ্যায়, অভিজিত মজুমদার, দেবদাস ঘোষ, তপেশ চক্রবর্তী ,তাপস নন্দী রাজা ব্যানার্জী , রতন দাস, অনির্বাণ চক্রবর্তী, রুপম শীল, মাস্টার অনবদ্য, বেবী সেনগুপ্ত, সঙ্গীতা চৌধুরী, সুমিতা মজুমদার, অভিষ্পা চক্রবর্তী, সময়িতা নন্দী, সরবানি ব্যানার্জী, মৌসুমী পাল, তিথি বিশ্বাস। বিশেষ করে রাজু ধর ও সমরেশ বসু অসাধারণ অভিনয়ের সাক্ষর রয়েছেন এই নাটকে। নেপথ্যে যারা কাজ করেছেন তারা হলেন ,আবহ নির্মাণ ও প্রহ্মেপণ তপন বিশ্বাস, মঞ্চ ভাবনা দেবব্রত মাইতি, মঞ্চ নির্মাণ মদন হালদার, আলোক ভাবনা ও প্রহ্মেপণ সমর-সাধন, মঞ্চ উপকরণ সমিত দাস,
রূপসজ্জা অলোক দেবনাথ, নামাঙ্কন ও পোশাক দেবব্রত দাস, নৃত্য পরিকল্পনা মীনান্ধী মুখার্জী,স্থির চিত্র সন্দীপ কুমার, প্রযোজনা নিয়ন্ত্রণ অভিজিত মজুমদার। সব মিলিয়ে এই সময়ের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রযোজনা অঙ্গন বেলঘরিয়া র এই নাটক "নিলামবালা ছে আনা" এক কথায় এই সময়ের
প্রেক্ষাপটে অতীতের অর্থাৎ ৬০-৭০-৮০ দশকের স্মৃতিচারণ। এই নাট্য দল ৩৯ বছরে পদার্পণ করলো। এইদিন নাটক শুরুর আগে সুমতি সেনগুপ্ত স্মৃতি সন্মাননা অঙ্গন বেলঘরিয়া র পক্ষ থেকে সদস্য সচিব পশ্চিমবঙ্গ সঙ্গীত , নৃত্য, নাটক ও দৃশ্যকলা একাডেমী র প্রধান ড:হৈমন্তী চট্টোপাধ্যায় তুলে দেন গ্রুপ থিয়েটার পত্রিকার সম্পাদক দেবাশিস বন্দোপাধ্যায় এর হাতে। মঞ্চে ছিলেন বিশিষ্ট নাট্যকার সঞ্জয় চট্টোপাধ্যায়। এক সাক্ষাৎকারে অঙ্গন বেলঘরিয়া আর কর্ণধার অভি সেনগুপ্ত বলেন আমার মা প্রয়াত সুমতি সেনগুপ্ত ছিলেন খুব নাট্য প্রেমী মানুষ। নিজে নাটক দেখতেন, আমায় ও বাড়ির সকলকে উৎসাহিত করতেন নাটক দেখার জন্য। তাই আমার মায়ের নামে দীর্ঘ ১০ বছর ধরে এই সন্মান দিয়ে আসছি। তিনি আরো জানালেন ৩৮ বছরের দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে অঙ্গন বেলঘরিয়া এখন ৩৯ শে পদার্পণ করলো। এ পর্যন্ত ৫০টির বেশী ছোটো নাটক এবং ১৫টি বেশী বড়ো নাটক মঞ্চস্থ করেছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য মুদ্রারাক্ষস, বিসর্জন, সাইটোল, বিপন্ন বিশ্বাস, টম এন্ড জেরি, মৌনবাঁশরী (বড়ো নাটক)ছোট নাটক দ্বিতীয় সীমান্ত, রামধনুর খোঁজে, পাঞ্জা,নীল সবুজ, ফিরে পাওয়া, নিঃসঙ্গতা, স্বাধীনতা কাকে বলে আরো অনেক।অঙ্গন পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে তৎসহ ভারতের বাইরেও সুনামের সাথে নাটক মঞ্চস্থ করে চলেছে। অঙ্গনের প্রাপ্তি অঙ্গনের পরিচালক অভি সেনগুপ্তর ২০১০সালে অভিনেতা হিসেবে নাট্য আকাদেমি পুরস্কার গ্রহণ। অঙ্গন সারা বছর বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে।এবছরের অঙ্গনের নতুন বড়ো প্রযোজনা " নীলামবালা ছে আনা। এইদিন নিলামবালা ছে আনা এই নাটকটি দেখতে এসেছিলেন বর্ষীয়ান দুই কমরেড বিমান বসু এবং বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য্য।
Comments
Post a Comment