ক্যান্সার জীবনের শেষ নয়—এই বার্তায় ক্যান্সার জয়ীদের মিলনমেলা আয়োজন করল মণিপাল হাসপাতাল ঢাকুরিয়া
ইন্দ্রজিৎ আইচ (কলকাতা):-ক্যান্সার জীবনের শেষ নয়, বরং জীবনের একটি অধ্যায়—এই বার্তাকে আরও জোরালো করতে মণিপাল হাসপাতাল ঢাকুরিয়া, ভারতের অন্যতম বৃহৎ স্বাস্থ্য পরিষেবা প্রদানকারী মণিপাল হসপিটালস গ্রুপের একটি ইউনিট, আয়োজন করল এক হৃদয়স্পর্শী ক্যান্সার জয়ীদের অনুষ্ঠান “ক্যান্সার যোদ্ধাদের সম্মাননা”। এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ডা. শুভায়ু বন্দ্যোপাধ্যায়, অ্যাডভাইজর ও কনসালট্যান্ট – কমপ্রিহেনসিভ ক্যান্সার কেয়ার সেন্টার এবং সিনিয়র কনসালট্যান্ট – জিআই অনকোলজি, মণিপাল হাসপাতাল ঢাকুরিয়া, সহ হাসপাতালের অন্যান্য বিশিষ্ট অনকোলজিস্ট ও চিকিৎসকবৃন্দ। এই অনুষ্ঠানে ক্যান্সার জয়ী রোগী, তাঁদের পরিবার-পরিজন, চিকিৎসক এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ একত্রিত হয়ে উদযাপন করেন সাহস, সুস্থতা ও মানব আত্মার অদম্য শক্তিকে।
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে এবং ভারতে ক্যান্সার একটি বড় স্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ নতুন ক্যান্সার রোগী শনাক্ত হচ্ছেন। তবে আগাম রোগ নির্ণয়, আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি এবং বিভিন্ন বিভাগের সম্মিলিত চিকিৎসার মাধ্যমে আজ ক্যান্সার রোগীদের জীবনযাত্রার মান ও বেঁচে থাকার সম্ভাবনা অনেকটাই বেড়েছে। ক্যান্সার জয়ীদের এই অনুষ্ঠানের মতো উদ্যোগ ভয় দূর করতে, সচেতনতা বাড়াতে এবং ক্যান্সার সংক্রান্ত সামাজিক কুসংস্কার ভাঙতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই ধরনের উদ্যোগ প্রমাণ করে যে ক্যান্সার এখন আর জীবন শেষ করে দেওয়া কোনও রোগ নয়, বরং সময়মতো চিকিৎসা করলে এটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য এবং অনেক ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য।
এই অনুষ্ঠান ক্যান্সার জয়ী রোগীদের জন্য তাঁদের লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হয়ে ওঠে। অনেকেই জানান, ক্যান্সার তাঁদের স্বপ্ন, আগ্রহ বা লক্ষ্যে পৌঁছনোর পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। ছবি আঁকা, আলোকচিত্র এবং অন্যান্য সৃজনশীল কাজের মাধ্যমে তাঁরা নিজেদের প্রতিভা তুলে ধরেন এবং জানান তাঁদের মানসিক দৃঢ়তার কথা। এই অভিজ্ঞতাগুলি বর্তমানে চিকিৎসাধীন রোগীদের কাছে আশার বার্তা পৌঁছে দেয়—ক্যান্সারের পরেও জীবন হতে পারে অর্থপূর্ণ, সৃজনশীল ও ইতিবাচক।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ডা. শুভায়ু বন্দ্যোপাধ্যায়, অ্যাডভাইজর, কমপ্রিহেনসিভ ক্যান্সার কেয়ার সেন্টার ও সিনিয়র কনসালট্যান্ট – জিআই অনকোলজি, মণিপাল হাসপাতাল ঢাকুরিয়া বলেন, “আজকের দিনে ক্যান্সার আর ভয়ের বিষয় নয় বা কোনও সামাজিক কুসংস্কারের সঙ্গে জড়িত রোগ নয়। আধুনিক চিকিৎসা এবং সময়মতো হস্তক্ষেপের ফলে অনেক ক্যান্সার এখন সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য। ক্যান্সার জয়ীদের জীবনযাত্রার মান এবং আয়ু দিন দিন বাড়ছে। এই ধরনের মিলনমেলা রোগীদের মনে করিয়ে দেয় যে ক্যান্সারের পরেও জীবন হতে পারে পূর্ণ, অর্থবহ ও আত্মবিশ্বাসে ভরপুর।”
মণিপাল হাসপাতাল ঢাকুরিয়ার হাসপাতাল ডিরেক্টর শ্রী দিলীপ কুমার রায় বলেন, “মণিপাল হাসপাতাল ঢাকুরিয়ায় আমরা উন্নত প্রযুক্তি, অভিজ্ঞ চিকিৎসক এবং রোগীকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে সর্বোচ্চ মানের ক্যান্সার চিকিৎসা প্রদান করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমাদের লক্ষ্য শুধুমাত্র চিকিৎসা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতা, মানসিক সহায়তা এবং সমাজে সচেতনতা গড়ে তোলা।”
নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ৬৮ বছর বয়সী রোগী প্রণব সরকার বলেন, “আমি আর নিজেকে ক্যান্সার রোগী বলতে পছন্দ করি না, কারণ গত ছয় বছর ধরে আমি সম্পূর্ণ সুস্থ। ২০২০ সালে আমার প্রোস্টেটের অস্ত্রোপচার হয় এবং সৌভাগ্যক্রমে কেমোথেরাপি বা রেডিয়েশনের প্রয়োজন পড়েনি। বর্তমানে আমার পিএসএ রিপোর্ট সম্পূর্ণ স্বাভাবিক এবং চিকিৎসকরাও সন্তুষ্ট। এই অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে যে আগাম রোগ নির্ণয় কতটা জরুরি। আমি বিশ্বাস করি, ৫০ বছরের বেশি বয়সী প্রত্যেক পুরুষের বছরে একবার পিএসএ পরীক্ষা করানো উচিত।”
১৪ বছর বয়সী রোগী অভিষেক নন্দী (নাম পরিবর্তিত) বলেন, “১৪ বছর বয়সে আমার পায়ে একটি টিউমার ধরা পড়ে, যা পরে ক্যান্সার বলে জানা যায়। অন্যত্র প্রাথমিক চিকিৎসার পর আমাদের বলা হয়েছিল আমার অবস্থা খুবই গুরুতর। এরপর আমরা এখানে আসি, যেখানে ডা. অশুতোষ দাগা আমার চিকিৎসার দায়িত্ব নেন। প্রায় এক বছর ধরে আমি নিরন্তর যত্ন, সহায়তা এবং আশার আলো পেয়েছি। আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ে এই সহযোগিতা আমাদের ভরসা জুগিয়েছে। এই যাত্রায় চিকিৎসকদের মানবিকতা ও নিষ্ঠার জন্য আমরা চিরকৃতজ্ঞ।”
“ক্যান্সার যোদ্ধাদের সম্মাননা”-র মতো উদ্যোগের মাধ্যমে মণিপাল হাসপাতাল ঢাকুরিয়া ক্যান্সার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে, সহমর্মিতা গড়ে তুলতে এবং রোগীদের আত্মবিশ্বাস জোগাতে নিরন্তর কাজ করে চলেছে—যাতে প্রতিটি ক্যান্সার রোগী শুধু উন্নত চিকিৎসাই নয়, দীর্ঘস্থায়ী সহায়তা ও আশাও পায়। এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ডা. বাস্তব ঘোষ, কনসালট্যান্ট – ইউরোলজি; ডা. অশুতোষ দাগা, কনসালট্যান্ট – মেডিক্যাল অনকোলজি; ডা. শ্রেয়া ভট্টাচার্য, কনসালট্যান্ট – হেড অ্যান্ড নেক সার্জারি/অনকোলজি; ডা. সাগ্নিক রায়, কনসালট্যান্ট – সার্জিক্যাল অনকোলজি; ডা. যশস্বী চক্রবর্তী, কনসালট্যান্ট – হেমাটোলজি; ডা. পরমিতা রায়, কনসালট্যান্ট – গাইনেকোলজিক অনকোলজি; এবং ডা. অনির্বাণ হালদার, কনসালট্যান্ট – রেডিয়েশন অনকোলজি। এছাড়াও ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন ডা. সৌমেন বসু, সিনিয়র কনসালট্যান্ট – রেডিয়েশন অনকোলজি এবং ডা. তন্ময় কুমার মণ্ডল, কনসালট্যান্ট – মেডিক্যাল অনকোলজি। এই উপস্থিতি মণিপাল হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগের সমন্বিত ও রোগীকেন্দ্রিক ক্যান্সার চিকিৎসা ব্যবস্থাকে আরও দৃঢ় করে তোলে।
Comments
Post a Comment