শ্বাসরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুহূর্তেই স্বস্তি... সেই পরিষেবা দেবে রুবি জেনারেল হাসপাতাল
ইন্দ্রজিৎ আইচ (কলকাতা):-কলকাতায় জীবনরক্ষাকারী মিনিমালি ইনভেসিভ শ্বাসনালীর চিকিৎসা পদ্ধতি রুবি জেনারেল হাসপাতাল, কলকাতার পালমোনোলজি ও রেসপিরেটরি মেডিসিন বিভাগ দীর্ঘদিন ধরেই জরুরি পরিস্থিতিতে অ্যাডভান্সড ইন্টারভেনশনাল পালমোনোলজি সংক্রান্ত চিকিৎসা পরিষেবা সফলভাবে প্রদান করে আসছে। অ্যাডভান্সড ইন্টারভেনশনাল পালমোনোলজি একটি দ্রুত বিকাশমান চিকিৎসা শাখা, যেখানে শ্বাসনালী, ফুসফুস ও প্লুরাল রোগের জটিল সমস্যার জন্য মিনিমালি ইনভেসিভ (অল্প আঘাতমূলক) ডায়াগনস্টিক ও থেরাপিউটিক পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। অনেক ক্ষেত্রেই এই আধুনিক পদ্ধতিগুলি প্রচলিত সার্জারির বিকল্প হিসেবে কাজ করে এবং বেশিরভাগ সময়েই আউটডোর বা স্বল্পমেয়াদি ভর্তি চিকিৎসার মাধ্যমে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়।
গত এক মাসে রুবি জেনারেল হাসপাতালের নিবেদিতপ্রাণ ইন্টারভেনশনাল পালমোনোলজি টিম—ডা. শুভঙ্কর চক্রবর্তী, ডা. দেবপ্রসাদ দাস ও ডা. রিকসোম চ্যাটার্জি—দুটি অত্যন্ত বিরল ও জীবনরক্ষাকারী ইন্টারভেনশনাল প্রক্রিয়া সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন। এই ধরনের চিকিৎসা পূর্ব ভারতে অত্যন্ত দুর্লভ এবং কোনো রকম কাটাছেঁড়া ছাড়াই জীবন-হানিকর পরিস্থিতিকে মুহূর্তের মধ্যে স্বস্তিতে রূপান্তর করেছে। এই চিকিৎসাগুলির ফলে রোগীদের দ্রুত সুস্থতা ও ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া গেছে।
নিচে আমরা সেই দুটি বিশেষ চিকিৎসা পদ্ধতির সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরছি l
প্রথম :
ঝাড়খণ্ডের ৬২ বছর বয়সী এক মহিলা রোগী প্রথমে ওপিডিতে আসেন ক্রমবর্ধমান শ্বাসকষ্ট, শুকনো কাশি, মাঝে মাঝে রক্তমিশ্রিত কাশি ও বাম পাশে তীব্র বুকের ব্যথা নিয়ে, যা তিনি প্রায় তিন মাস ধরে ভুগছিলেন। ওপিডিতে অপেক্ষারত অবস্থায় তাঁর শ্বাসপ্রশ্বাস নেওয়া এতটাই কষ্টকর হয়ে ওঠে যে তাঁকে জরুরি ভিত্তিতে ভর্তি করতে হয়। সম্পূর্ণ ক্লিনিক্যাল ও রেডিওলজিক্যাল পরীক্ষার পর ভিডিওব্রঙ্কোস্কপি করা হয়, যেখানে দেখা যায় বাম দিকের প্রধান শ্বাসনালী সম্পূর্ণভাবে একটি বড় টিউমার দ্বারা অবরুদ্ধ, যার ফলে বাম ফুসফুস পুরোপুরি বসে গেছে (collapse)। পরিবারের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা ও লিখিত সম্মতির পর রোগীকে জেনারেল অ্যানেস্থেশিয়ায় রিজিড ব্রঙ্কোস্কপি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দক্ষ পালমোনোলজিস্টদের টিম অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সম্পূর্ণ টিউমারটি অপসারণ করেন এবং শ্বাসনালী পুনরায় খুলে দেওয়া হয়। চিকিৎসার পর বাম দিকের শ্বাসনালী সম্পূর্ণভাবে খুলে যাওয়ায়, ফুসফুস আবার পুরোপুরি প্রসারিত হয় এবং রোগী তাৎক্ষণিক স্বস্তি অনুভব করেন। দীর্ঘ সময় ফুসফুস বসে থাকলে এই ফলাফল সম্ভব হতো না। রিজিড ব্রঙ্কোস্কপি এই জটিল চিকিৎসাকে সফল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। রিজিড ব্রঙ্কোস্কপি একটি মিনিমালি ইনভেসিভ অপারেটিভ পদ্ধতি, যার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় শ্বাসনালীর অবরোধ—যেমন টিউমার, বাহিরের বস্তু বা সংকোচন—দেখা ও চিকিৎসা করা যায়। এটি বিশেষভাবে টিউমার অপসারণ, মারাত্মক রক্তক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ, শ্বাসনালীতে স্টেন্ট বসানো ইত্যাদির জন্য ব্যবহৃত হয়।
দ্বিতীয় :
মেদিনীপুরের ৬৯ বছর বয়সী এক প্রবীণ ব্যক্তি শ্বাসকষ্ট ও বুকের অস্বস্তি নিয়ে আসেন, যাঁর পূর্ব থেকেই সিওপিডি (COPD) রোগ ছিল। দীর্ঘদিনের ধূমপায়ী হওয়ায় তাঁর লো ডোজ সিটি স্ক্যান (CT Thorax) করা হয়, যেখানে ডান ফুসফুসের উপরের অংশে একটি স্পিকুলেটেড নডিউল এবং বাম ফুসফুসের উপরের অংশের শ্বাসনালীর ভিতরে একটি ডাঁটাযুক্ত টিউমার ধরা পড়ে। পরবর্তী FDG ডিজিটাল PET-CT স্ক্যানে উল্লেখযোগ্য SUV uptake দেখা যায়, যা ক্যান্সারের সম্ভাবনা প্রবল করে তোলে। ইন্টারভেনশনাল পালমোনোলজি টিমের ব্রঙ্কোস্কপিতে দেখা যায় যে বাম দিকের উপরের লোবের অ্যান্টেরিয়র সেগমেন্টের শ্বাসনালী সম্পূর্ণভাবে একটি সেসাইল-পেডাঙ্কুলেটেড এন্ডোব্রঙ্কিয়াল টিউমারে বন্ধ হয়ে রয়েছে। উন্নত ইন্টারভেনশনাল প্রযুক্তির সাহায্যে ব্রঙ্কোস্কোপিক স্নেয়ার ও ইলেক্ট্রোকটারি ব্যবহার করে সম্পূর্ণ টিউমারটি একসাথে (en bloc) অপসারণ করা হয়। যথাযথভাবে রক্তক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ করা হয় এবং শ্বাসনালী সম্পূর্ণভাবে পুনরায় খোলা হয়। ডান ফুসফুসের উপরের অংশের নডিউল থেকে রেডিয়াল EBUS (ক্যাথেটার)-এর সাহায্যে বায়োপসি নেওয়া হয়। রোগী সম্পূর্ণভাবে এই প্রক্রিয়া সহ্য করেন, চিকিৎসার পর স্থিতিশীল থাকেন এবং বর্তমানে উল্লেখযোগ্য উপসর্গের উন্নতি সহ সুস্থ রয়েছেন। এই ক্ষেত্রেও আধুনিক EBUS যন্ত্র চিকিৎসাটিকে সম্ভব করেছে। রুবি জেনারেল হাসপাতালে ২৪ ঘণ্টা রেসপিরেটরি ম্যানেজমেন্ট টিম সক্রিয় রয়েছে এবং সারাক্ষণ প্রশিক্ষিত ইন্টারভেনশনাল পালমোনোলজিস্টদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়। এই বিশেষজ্ঞ দল জীবননাশের মুখে থাকা পরিস্থিতিকে দ্রুত ও নিরাপদভাবে স্বস্তিতে রূপান্তর করতে সক্ষম। আমরা আশা করি, ভবিষ্যতেও আরও বেশি মানুষের জীবন রক্ষা করতে পারব এবং রোগীরা যদি প্রাথমিক পর্যায়েই আমাদের কাছে আসেন, তবে দ্রুত রোগ নির্ণয় ও উন্নত চিকিৎসার সুযোগ পাওয়া সম্ভব হবে। আপনাদের সম্মানিত মিডিয়ার মাধ্যমে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দিতে চাই— সামান্য শ্বাসকষ্ট বা শ্বাসজনিত সমস্যাকেও কখনোই অবহেলা করা উচিত নয়।
Comments
Post a Comment