আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০২৬ উদযাপন করল মণিপাল হসপিটাল
ইন্দ্রজিৎ আইচ (কলকাতা):- নেতৃত্ব, সাহস এবং সংগ্রামজয়ের একাধিক অনুপ্রেরণাদায়ী গল্পকে সামনে রেখে আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০২৬ উদযাপন করল মণিপাল হসপিটালস কলকাতা। বিভিন্ন ক্ষেত্রের অনুপ্রেরণাদায়ী নারীদের সম্মান জানাতে আয়োজিত এই বিশেষ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নারী নেতৃত্ব, চিকিৎসক এবং গুরুতর অসুস্থতা কাটিয়ে ওঠা নারী রোগীরা। তাঁদের সাফল্য, জীবনসংগ্রাম এবং অভিজ্ঞতার কথা ভাগ করে নেওয়ার পাশাপাশি নারীদের স্বাস্থ্য ও সুস্থতা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির বার্তাও তুলে ধরা হয়।
এই উপলক্ষে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য একাধিক বিশিষ্ট নারীকে সম্মাননা জানানো হয়। সম্মানপ্রাপ্তদের মধ্যে ছিলেন জেসিকা গোমেস সুরানা, প্রিন্সিপাল, বিড়লা হাই স্কুল মুকুন্দপুর; নেহা সিংহ এবং রুহি সিংহ, ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর লেফটেন্যান্ট কর্নেল (ডা.); স্মিতা রায় চৌধুরী, একটি খ্যাতনামা সংবাদপত্রের জনপ্রিয় বিনোদন সংযোজনের সম্পাদক; এবং ডা. অঞ্জনা মালহোত্রা, প্রিন্সিপাল চিফ মেডিক্যাল ডিরেক্টর, সেন্ট্রাল হসপিটাল, সাউথ ইস্টার্ন রেলওয়ে, কলকাতা।
অনুষ্ঠানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল একটি বিশেষ প্যানেল আলোচনা, যেখানে উপস্থিত নারী নেতৃবৃন্দ তাঁদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং কর্মজীবনে নারীদের সম্মুখীন হওয়া বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ নিয়ে মতামত তুলে ধরেন। আলোচনায় কর্মক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা, অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মপরিবেশের প্রয়োজনীয়তা, মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব এবং পেশাগত দায়িত্বের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্য বজায় রাখার চাপের মতো বিষয়গুলি গুরুত্ব পায়।
শহরের বিভিন্ন ইউনিট থেকে মণিপাল হসপিটালস-এর চিকিৎসকরাও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন এবং সমাজে নারীদের অবদানের জন্য তাঁদের সম্মাননা জানান। ব্রডওয়ে, ঢাকুরিয়া, ইএম বাইপাস, মুকুন্দপুর এবং সল্টলেক ইউনিটের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা এতে অংশগ্রহণ করেন। অর্থোপেডিক্স, অনকোলজি, নেফ্রোলজি, গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি, নিউরোসার্জারি, কার্ডিওলজি এবং প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগের বিশেষজ্ঞরাও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
নারীদের মধ্যে সময়মতো অস্ত্রোপচার ও চিকিৎসা সচেতনতার গুরুত্ব তুলে ধরে ডা. অভিষেক ভৌমিক, কনসালট্যান্ট – জেনারেল ও ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারি, মণিপাল হসপিটাল ব্রডওয়ে বলেন, “অনেক সময় নারীরা পেটের বিভিন্ন সমস্যা বা সার্জিক্যাল উপসর্গকে উপেক্ষা করেন, যতক্ষণ না তা তাঁদের দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলতে শুরু করে। বর্তমানে মিনিমালি ইনভেসিভ ও ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারির অগ্রগতির ফলে অনেক সমস্যার নিরাপদ চিকিৎসা সম্ভব, যেখানে দ্রুত সুস্থ হওয়া যায় এবং অস্বস্তিও কম থাকে। তাই সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া নারীদের স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।”
ইউরোলজিক্যাল ক্যান্সারের ক্ষেত্রে দ্রুত রোগ নির্ণয়ের গুরুত্ব তুলে ধরে ডা. বাস্তব ঘোষ, সিনিয়র কনসালট্যান্ট – ইউরো-অনকোলজিস্ট, মণিপাল হসপিটাল ঢাকুরিয়া বলেন, “কিডনি ও মূত্রনালীর ক্যান্সারসহ অনেক ইউরোলজিক্যাল সমস্যা অনেক সময় দেরিতে ধরা পড়ে, যখন তা জটিল পর্যায়ে পৌঁছে যায়। প্রাথমিক পর্যায়ে স্ক্রিনিং, উপসর্গ সম্পর্কে সচেতনতা এবং সময়মতো চিকিৎসা নেওয়া চিকিৎসার ফলাফল অনেকটাই উন্নত করতে পারে। একইসঙ্গে এই ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যাগুলি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা জরুরি, যাতে বিশেষ করে নারীরা সঠিক সময়ে চিকিৎসা নিতে স্বচ্ছন্দ বোধ করেন।”
নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্য ও প্রতিরোধমূলক চিকিৎসার গুরুত্ব তুলে ধরে ডা. অভিনিবেশ চট্টোপাধ্যায়, সিনিয়র কনসালট্যান্ট – প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগ, মণিপাল হসপিটাল সল্টলেক বলেন, “নারীদের স্বাস্থ্য জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে ধারাবাহিক যত্নের প্রয়োজন—প্রজনন স্বাস্থ্য থেকে শুরু করে হরমোনজনিত পরিবর্তন এবং নিয়মিত স্ক্রিনিং পর্যন্ত। নিয়মিত গাইনোকলজিক্যাল পরীক্ষা, উপসর্গ সম্পর্কে সচেতনতা এবং সময়মতো চিকিৎসা পরামর্শ অনেক জটিলতা প্রতিরোধ করতে সাহায্য করতে পারে। নারীদের নিজেদের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন ও ক্ষমতায়িত করে তোলাই দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতা নিশ্চিত করার অন্যতম কার্যকর উপায়।”
অনুষ্ঠানে এক আবেগঘন ও অনুপ্রেরণামূলক মুহূর্ত তৈরি হয় যখন গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যাকে সাহসের সঙ্গে জয় করা কয়েকজন নারী রোগীকেও সম্মান জানানো হয়। তাঁরা তাঁদের সংগ্রাম, সাহস এবং সুস্থ হয়ে ওঠার অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন, যা উপস্থিত সকলকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে।
নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে সঞ্চিতা দে ভট্টাচার্য, যিনি মণিপাল হসপিটাল ঢাকুরিয়ায় ডা. বাস্তব ঘোষের তত্ত্বাবধানে কিডনির গুরুতর সমস্যার চিকিৎসা করিয়েছেন, বলেন, “কিডনির গুরুতর রোগ ধরা পড়ার পর প্রথমে খুব ভয় লাগছিল। কিন্তু সময়মতো চিকিৎসা এবং চিকিৎসকের উৎসাহ আমাকে সাহসের সঙ্গে পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে শক্তি দিয়েছে। এই অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে যে কঠিন সময়েও আশাবাদী থাকা এবং দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া কতটা গুরুত্বপূর্ণ।”
নিজের সুস্থ হয়ে ওঠার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মিঠু দত্ত, যিনি মণিপাল হসপিটাল ব্রডওয়েতে ডা. অভিষেক ভৌমিকের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা নিয়েছেন, বলেন, “আমার চিকিৎসার পথটা সহজ ছিল না, কিন্তু এই অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে যে দৃঢ় মনোবল থাকলে
যে কোনো কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলা করা যায়। চিকিৎসক এবং পরিবারের সমর্থন আমাকে আত্মবিশ্বাস ফিরে পেতে সাহায্য করেছে। আজ আমি কৃতজ্ঞ এবং আশাবাদী—কারণ অধ্যবসায় আমাদের যেকোনো প্রতিকূলতাকে জয় করতে সাহায্য করতে পারে।”
নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে অমৃতা মুখার্জি, যিনি মণিপাল হসপিটাল সল্টলেকে ডা. অভিনিবেশ চট্টোপাধ্যায় এবং ডা. পলি চট্টোপাধ্যায়ের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা নিয়েছেন, বলেন, “একটি কঠিন গাইনোকলজিক্যাল সমস্যার মধ্য দিয়ে যাওয়া সহজ ছিল না। কিন্তু চিকিৎসকদের যত্ন ও আশ্বাস পুরো সময়টায় আমাকে ইতিবাচক থাকতে সাহায্য করেছে। এই অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে সুস্থ হয়ে ওঠার পথে চিকিৎসকদের উপর আস্থা রাখা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। আজ আমি নিজেকে আরও সুস্থ, কৃতজ্ঞ এবং মানসিকভাবে অনেক বেশি শক্তিশালী মনে করি।”
এই আয়োজনের মাধ্যমে মণিপাল হসপিটালস কলকাতা আবারও সমাজকে অনুপ্রাণিত করা নারীদের সম্মান জানানোর পাশাপাশি নারীদের জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করল।
Comments
Post a Comment