গোবরডাঙ্গা নাবিক নাট্যমের এই বছরের নতুন প্রযোজনা " খেলা " এই নাটকে সকলের অভিনয় খুবই প্রাণবন্ত
ইন্দ্রজিৎ আইচ (কলকাতা):- নাবিক নাট্যমের নতুন নাটক "খেলা " সম্প্রতি শিল্পায়ন স্টুডিও তে মঞ্চস্থ হলো। এক অন্ধ বৃদ্ধ মায়ের করুন কাহিনী নিয়ে এই নাটক, মা তার সন্তানের জন্য পাগল হয়ে গেছে। সারাদিন দরজার দিকে তাকিয়ে ভাবে এই বুঝি তার ছেলে আসবে। ১৫ বছর সে ছেলেকে দেখেনা। সারাদিন ছেলের ছোটবেলার স্মৃতিগুলো তার মনে ও ঠোঁটে লেগে থাকে। বাবা নিরবে সব দেখে কিন্তু কিছু বলার শক্তি পায় না । এইভাবে দিন কাটতে থাকে, মায়ের পাগলামি ও আরো বাড়তে থাকে, ছেলে ফোন করে না, বাবা মা ফোন করলে ফোন ধরে না। মায়ের মানসিক যন্ত্রণা বাড়তে থাকে, বাবা এই যন্ত্রনা সহ্য করতে না পেরে লুকোচক্ষুর আড়ালে একটি এজেন্সির সাথে কথা বলে, শর্ত একটাই নকল ছেলেকে মা যেন কিছুতেই বুঝতে না পারে, কিছু সময়ের জন্য হলেও মা যেন তার নিজের সন্তানকে ফিরে পায়। সেদিন দুপুরের ছেলের বেশে একজন যুবক আসে সাথে বৌমা। দরজা খুলতেই মায়ের চোখ আনন্দে জ্বলে ওঠে। সে বিশ্বাস করে ফেলে তার ছেলে ও বৌমা এসেছে। মা তখন আর অসুস্থ নয়, তখন সে শুধু একজন মা। ছেলেকে খাওয়ায় মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়, ছেলে ও বউ নিখুঁত অভিনয় করে চলে। মা আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওঠে। বাবার বুকের ভেতরটা ভেঙ্গে যায় বারবার তার মনে হতে থাকে সে মায়ের সাথে চিটিং করছে, তবু সে নিজেকে শক্ত রাখে কারন সে জানে এই ছোট্ট মিথ্যেটাই আজ তার মায়ের বড় ঔষধ। একসময় ছেলে এবং বৌমা দুজনই চলে যায় বাবা কিছুটা স্বস্তি অনুভব করে। মা চুপ করে কি যেন ভাবে তারপর মৃদু হেসে বলে ওঠে - " খেলাটা কিন্তু বেশ হল " বাবা থমকে যায়, মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। সে আর চোখের জল লুকাতে পারে না, মা চিৎকার করে বলতে থাকে "আমি আবার খেলব " - কানামাছি ভো..... ভো.....। মা কথা বলতে বলতে নিশ্চুপ হয়ে যায়, দর্শকের উদ্দেশ্যে হাত বাড়িয়ে বলে - আপনারা কেউ খেলবেন আমার সঙ্গে। দর্শকের কাছে নাটকটি অত্যন্ত সুন্দর ও শিক্ষণীয় হয়ে উঠেছে। গল্পের ধারাবাহিকতা এবং শিল্পীদের অভিনয় সত্যি খুব প্রশংসনীয়। এই নাটকটি আমাদের সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা তুলে ধরেছে। অভিনেতা অভিনেত্রী অভিনয় এতটাই বাস্তব ছিল যে মনে হচ্ছিল ঘটনা গুলো চোখের সামনে ঘটছে। মঞ্চে সজ্জা,আলো ও সংগীতের ব্যবহার নাটকটি কে আরো প্রাণবন্ত করে তুলেছে। মায়ের চরিত্রে শ্রাবণী সাহা অনবদ্য। বাবার চরিত্রে প্রদীপ কুমার সাহা নাটকের দ্বন্দ্বটাকে সারাক্ষণ বজায় রেখেছেন। কমলিকা এবং বৌমার চরিত্রে রাখি বিশ্বাস বেশ স্বাভাবিক ও সুন্দরও সাবলীল অভিনয় করেছেন। দীপঙ্কর ও ছেলের চরিত্রে অবিন দত্ত দক্ষ অভিনেতার পরিচয় দিয়েছেন। ডাক্তারের চরিত্রে শর্মিষ্ঠা সাধু খাঁ বেশ ভালো। নির্দেশক জীবন অধিকারী বলেন এই নাটকে আশীষ চট্টোপাধ্যায়ের সুপরামর্শ নাটকটির মধ্যে অন্য মাত্ৰা এনে দিয়েছে । সব মিলিয়ে নাবিক নাট্যম একটি সুন্দর ও সুস্থ প্রযোজনা আমাদের উপহার দিলেন। নির্দেশক জীবন অধিকারী জানান জীবনের শেষ প্রান্তে এসে অনেক বৃদ্ধ বাবা-মা আজ অবহেলা আর একাকিত্বের ভার বহন করে চলেছেন। যাঁরা একসময়ে সন্তানের সুখের জন্য নিজেদের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়েছিলেন আজ সেই সন্তানদের কাছেই তারা হয়ে উঠেছেন বোঝা। কর্মব্যস্তের অজুহাতে, আধুনিকতার মোড়কে ঢেকে যায় কর্তব্যবোধ ও মানবিকতা। বৃদ্ধ বয়সে শরীর ভেঙে পড়ে, মন চায় একটু স্নেহ, একটু সহানুভূতির কথা কিন্তু অনেক সময় তাদের ভাগ্যে জোঠে না । কখনো বৃদ্ধাশ্রমে, কখনো নিজের ঘরেই তারা নিঃসঙ্গ বন্দী। সন্তানেরা ভুলে যায় আজ তারা যেখানে দাঁড়িয়ে আছে তার পিছনে বাবা-মায়ের ত্যাগের ইতিহাস রয়েছে। এই করুন বাস্তবতা আমাদের ভাবতে শেখায় পরিবার মানে শুধু সুবিধা নয়, দায়িত্বও। বৃদ্ধ বাবা মায়ের প্রতি যত্ন ও ভালবাসাই সভ্য সমাজের প্রকৃত পরিচয়। মায়া, মমতা,,স্নেহ,ভালবাসা ও মানবতাকে উন্নীত করার বার্তা বহন করে খেলা নাটকটি।
Comments
Post a Comment