বন্দে মাতৃকা'- থিয়েটার শাইনের নতুন নাটকএ যেন এক শহীদের স্মৃতি তর্পণ
ইন্দ্রজিৎ আইচ (কলকাতা):-সমসাময়িক নাটকে দেশপ্রেম মানেই অনেক সময় ইতিহাসের পুরোনো গল্প আওড়ানো। ভারত সরকার সংস্কৃতি মন্ত্রকের সঙ্গীত নাটক একাডেমির ন্যাশনাল থিয়েটার ফেস্টিভ্যাল ২০২৬ আয়োজনে গত ১৫ ই জুলাই
বুধবার সন্ধ্যায় উত্তরপাড়া গণ ভবনে মঞ্চস্থ হলো দেশপ্রেম নিয়ে সমসাময়িক ভাবনায় থিয়েটার শাইন এর নতুন নাটক " বন্দে মাতৃকা " ।থিয়েটার শাইন নিবেদিত শুভজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশনায় 'বন্দে মাতৃকা... প্রথম শহীদ নারীর কথা'। এই নাটকটা একটাই জরুরি প্রশ্ন তোলে - "আজকের দিনে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার কেন প্রাসঙ্গিক?
এখানে প্রীতিলতার জীবনীকে গতানুগতিক ভাবে দেখানো হয়নি। বরং তাঁর গল্পকে আজকের সময়ের আতঙ্ক, ভয় আর নীরবতার সাথে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। ইতিহাস এখানে আমাদের সাথে কথা বলে।এ
নাটক শুরু হয় ইরাকে দিয়ে। এক তরুণী। তার সহকর্মী, গুরু এবং প্রেরণা অমিতাভকে নৃশংস ভাবে খুন করা হয়েছে। ফোনে ক্রমাগত হুমকি। আতঙ্কে সে পুলিশের কাছেও যেতে পারছে না, প্রতিবাদের ভাষাও হারিয়েছে। ঠিক এই অসহায় মুহূর্তেই নাটক বাস্তবতার খোলস ছেড়ে বেরোয়। এক রহস্যময় চরিত্রের হাত ধরে ইরা এক স্বপ্ন-যাত্রায় যায়। সেখানে সে দেখা পায় প্রীতিলতা ও তাঁর বিপ্লবী সাথীদের। তারাই ইরাকে শেখায় - বাইরের অত্যাচারের বিরুদ্ধে লড়ার আগে ভেতরের ভয়টাকে জয় করতে হবে।
সুবজিত বন্দ্যোপাধ্যায়ের সবচেয়ে বড় সাফল্য এখানেই - তিনি প্রীতিলতাকে ইতিহাসের পাতায় বন্দি করে রাখেননি। নাট্যকার নিজে এবং অনুপম দাশগুপ্ত প্রীতিলতাকে করে তুলেছেন এক জীবন্ত শক্তি। যার সাহস আজও আমাদের সাথে কথা বলে। স্বাধীনতা শুধু অতীতের রাজনৈতিক জয় নয়। এটা প্রতিদিনের লড়াই - নীরবতার বিরুদ্ধে, হুমকির বিরুদ্ধে, সামাজিক হিংসার বিরুদ্ধে, আর নিজের মনের দুর্বলতার বিরুদ্ধে। এখানে দেশপ্রেমের মানে বদলে যায়। দেশপ্রেম মানে শুধু জাতীয়তাবাদ নয়। দেশপ্রেম মানে নিজের সময়ে সত্যের পাশে দাঁড়ানোর সাহস। মঞ্চভাবনা ইচ্ছাকৃত ভাবেই অবাস্তব। ইরার জেগে ওঠা এক প্রতীকী জঙ্গলে। যেখানে স্মৃতি, ইতিহাস আর কল্পনা একসাথে মেশে। সাদা কাগজে মোড়া থামগুলোই আলো আর অভিনয়ের জাদুতে হয়ে ওঠে জঙ্গল, ব্যারিকেড, জেলের দেওয়াল। এত অল্প উপকরণে এত বড় ক্যানভাস - এখানেই থিয়েটার সাইনের জয়।
*এই নাটকে অভিনয়* সমষ্টিগত। এরিনা চন্দা ভৌমিক, গ্রেসি চৌধুরী, দেবব্রত পাল, সুনিত ভোই, চিরাগ মালাকার, রাহুল বোস, তানিয়া চ্যাটার্জি, পরমিতা দাস, রোদসী সরকার, দীপক সমাদ্দার, জয়স্মিতা বিশ্বাস, তৃষা বিশ্বাস, নিমিশা বিশ্বাস, অনিরুদ্ধ বিশ্বাস, প্রজ্ঞানশ্রী চৌধুরী, চন্দনা বিশ্বাস - কেউ কারোর থেকে কম নন। গোটা দল একটা শরীরের মতো কাজ করেছে। আলো এই নাটকের আরেক নায়ক। নকশা ও রূপায়ণ - সুবজিত বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে। আলো-আঁধারের কনট্রাস্ট দিয়ে তিনি বাস্তব আর স্বপ্ন, ভয় আর সাহসকে আলাদা করেছেন। আলো এখানে শুধু দেখায় না, গল্পও বলে। সৌভিক হালদারের নির্দেশনায়, সৌভিকের গিটার-ডোটরা, দেবার্ঘ্য দাসের সারোদ, অঙ্কিতা দাসের কণ্ঠ, অনির্বাণ দাসের তবলা, শান্তনু পাণ্ডার পার্কাশন - সব মিলে এক আবেগী সাউন্ডস্কেপ। সঙ্গীত এখানে সাজ নয়, গল্পের অংশ। পাশাপাশি পর্দার আড়ালে - অনন্যা ঘোষের শব্দ, অশোক কামিলা, বিশ্বজিৎ ভৌমিক, সৌমেন গুপ্তর নিখুঁত ব্যাকস্টেজ - এঁরা না থাকলে এই স্বপ্ন অসম্পূর্ণ থেকে যেত।
শেষ কথা একটাই
'বন্দে মাতৃকা' সফল কারণ এটা প্রীতিলতাকে মিউজিয়ামের মূর্তি করে রাখেনি। এটা মনে করিয়ে দেয় - প্রতি প্রজন্মের নিজস্ব লড়াই আছে। নিজস্ব নীরবতা আছে, যা ভাঙতে হবে। নিজস্ব সাহস আছে, যা খুঁজে নিতে হবে। স্বাধীনতা সংগ্রামের আত্মত্যাগকে আজকের নৈতিক সংকটের সাথে জুড়ে দিয়ে সুরজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় এমন একটা নাটক তৈরি করেছেন যা রাজনৈতিক ভাবেও জরুরি, আবার আবেগের দিক থেকেও নাড়া দেয়। বিপ্লবীদের প্রতি সত্যিকারের শ্রদ্ধা তাঁদের মনে রাখা নয়। তাঁদের সাহসকে আজকের দিনে বাঁচিয়ে রাখা।
Comments
Post a Comment